Mother and Child Care for the First 3 Years ( মা ও শিশুর যত্ন প্রথম ৩ বছর পর্যন্ত )
মা ও শিশুর যত্ন: জীবনের প্রথম তিন বছরের জন্য একটি নির্দেশিকা
সন্তানের জীবনের প্রথম তিন বছর মা ও শিশু উভয়ের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এই সময়ে সঠিক যত্ন শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে এবং মায়ের সুস্থতা নিশ্চিত করে। জীবনের এই নতুন অধ্যায়ে মা ও শিশুর যত্নকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে: নবজাতকের যত্ন (প্রথম ২৮ দিন), শিশুকাল (১ মাস থেকে ১ বছর) এবং প্রারম্ভিক শৈশব (১ থেকে ৩ বছর)।
নবজাতকের যত্ন (জন্ম থেকে ২৮ দিন)
জীবনের প্রথম ২৮ দিন শিশুর জন্য অত্যন্ত নাজুক এবং এই সময়টিকে নবজাতক পর্ব বলা হয়। এই সময়ে সঠিক যত্ন শিশুর আজীবন স্বাস্থ্য ও বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে।
খাওয়ানো:
- জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা উচিত।
- মায়ের প্রথম গাঢ় হলুদ দুধ, যা শালদুধ বা কোলোস্ট্রাম নামে পরিচিত, তা শিশুর জন্য অত্যন্ত উপকারী এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
- নবজাতককে প্রতি ২-৩ ঘন্টা পর পর অর্থাৎ ২৪ ঘন্টায় ৮-১২ বার বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।
- প্রতিবার দুধ খাওয়ানোর পর শিশুর ঢেঁকুর তোলানো উচিত যাতে পেটে গ্যাস জমে অস্বস্তি না হয়।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য যত্ন:
- শিশুকে ধরার আগে অবশ্যই হাত স্যানিটাইজ করে নিতে হবে, কারণ তাদের সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে।
- নাভি না শুকানো পর্যন্ত শিশুকে গোসল করানো উচিত নয়। নাভি শুকনো ও পরিষ্কার রাখতে হবে এবং কোনো ধরনের তেল বা মলম লাগানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
- শিশুর ত্বকের জন্য জলপাই তেল সবচেয়ে ভালো; সরিষার তেল ব্যবহার করা উচিত নয়।
- শিশুর চোখ ও জিহ্বা নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।
- শিশুর নখ দ্রুত বাড়ে, তাই ঘুমের সময় সাবধানে কেটে দিতে হবে যেন নিজের আঁচড়ে ক্ষত না হয়।
টিকা:
জন্মের পরপরই শিশুকে বিসিজি (যক্ষ্মা) এবং ওপিভি (পোলিও) টিকা দেওয়া হয়।
বিপদচিহ্ন:
শিশুর জ্বর (১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি) বা শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, বুকের দুধ টানতে না পারা, ঘন ঘন শ্বাস নেওয়া, খিঁচুনি বা নিস্তেজ হয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
শিশুকাল (১ মাস থেকে ১ বছর)
এই সময়ে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ দ্রুত গতিতে হতে থাকে।
খাবার:
প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে; এমনকি পানিও খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই।
ছয় মাস বয়সের পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি শিশুকে পরিপূরক খাবার দেওয়া শুরু করতে হবে।
প্রথমদিকে দুধের সাথে কলা চটকে বা সুজি রান্না করে খাওয়ানো যেতে পারে। এছাড়াও, চালের গুঁড়ো, আটা, পাকা পেঁপে, মিষ্টি ফল ইত্যাদি দেওয়া যেতে পারে।
৭-৯ মাস বয়সে শিশুকে আলু সেদ্ধ, মৌসুমি সবজি সেদ্ধ করে চটকিয়ে খাওয়ানো যায়। খাবারে সামান্য তেল যোগ করা যেতে পারে।
৯-১২ মাস বয়সে শিশু নরম খিচুড়ি, সিদ্ধ ডিম, ডাল, ভাত, দুধ-রুটি, দই, ক্ষীর, পুডিং ইত্যাদি খেতে পারে।
টিকা:
সরকারি টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহে শিশুকে পোলিও, ডিপিটি, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি (পেন্টাভ্যালেন্ট) এবং নিউমোনিয়ার (পিসিভি) টিকা দিতে হবে।
৯ মাস পূর্ণ হলে হাম ও রুবেলার (এমআর) টিকা এবং ১৫ মাস বয়সে হামের টিকা দিতে হবে।
বিকাশ:
প্রতিদিন সকালে শিশুকে কিছুক্ষণ নরম রোদে রাখলে তা ভিটামিন-ডি তৈরিতে সাহায্য করে, যা হাড়ের বিকাশের জন্য জরুরি।
শিশুর সাথে কথা বলা, খেলা করা এবং বিভিন্ন ধরনের শব্দ ও সঙ্গীতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া তার মানসিক বিকাশে সাহায্য করে।
প্রারম্ভিক শৈশব (১ থেকে ৩ বছর)
এই বয়সে শিশুরা হাঁটতে, কথা বলতে ও নতুন অনেক কিছু শিখতে শুরু করে।
খাবার:
- এক বছর বয়সের পর থেকে শিশু ঘরের স্বাভাবিক খাবার খেতে পারে, তবে তা নরম ও কম মশলাযুক্ত হতে হবে।
- শিশুকে পুষ্টিকর খাবার যেমন ফল, সবজি, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ খাওয়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
- চিনিযুক্ত পানীয় এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।
মানসিক ও সামাজিক বিকাশ:
- শিশুর প্রতিটি কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তার ভালো কাজের প্রশংসা করা উচিত। এতে তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
- শিশুকে তার নিজের ছোট ছোট কাজ, যেমন- খাওয়ার পর প্লেটটা নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা, নিজের খেলনা গুছিয়ে রাখা ইত্যাদি করতে উৎসাহিত করুন। এটি তার মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করবে।
- শিশুর সাথে খেলাধুলা করা এবং তাকে মানসম্মত সময় দেওয়া তার মানসিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।
- শিশুরা অনুকরণপ্রিয়, তাই তাদের সামনে ভালো আচরণ করা এবং ইতিবাচক কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ।
মায়ের যত্ন:
গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে শিশুর জন্মের পর পর্যন্ত মায়ের নিজের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
- গর্ভাবস্থায় পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং ভারী কাজ এড়িয়ে চলা উচিত।
- প্রসবের পর মায়ের পর্যাপ্ত বিশ্রাম প্রয়োজন।
- শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের নিজেরও ক্যালোরি ও পুষ্টির চাহিদা বেড়ে যায়, তাই সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
- মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াও খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে পরিবারের সদস্য বা বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হবে।
সঠিক যত্ন ও ভালোবাসার মাধ্যমে একটি শিশু সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে। তাই, জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রথম তিন বছরে মা ও শিশুর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।