জরুরী অবস্থা ও প্রাথমিক চিকিৎসা
জরুরী অবস্থা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দুটি সম্পর্কিত ধারণা, কিন্তু এক জিনিস নয়। নিচে এদের সংজ্ঞা এবং সম্পর্ক দেওয়া হলো:
জরুরী অবস্থা (Emergency Situation):
জরুরী অবস্থা হলো এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে কোনো ব্যক্তি বা মানুষের জীবন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা স্বাস্থ্য তাৎক্ষণিক এবং গুরুতর বিপদের সম্মুখীন হয়। এই অবস্থায় দ্রুত এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেড়ে যেতে পারে, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। পেশাদার চিকিৎসা সহায়তা (যেমন ডাক্তার বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া) এই পরিস্থিতিতে জরুরি হয়ে পড়ে।
কিছু সাধারণ জরুরী অবস্থা:
- তীব্র রক্তপাত (Severe bleeding)
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা সংজ্ঞাহীনতা (Unconsciousness)
- শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া (Difficulty breathing or stopped breathing)
- হঠাৎ বুকে তীব্র ব্যথা (Possible heart attack)
- স্ট্রোকের লক্ষণ (Stroke symptoms)
- হাড় ভেঙে যাওয়া বা জয়েন্ট সরে যাওয়া (Fractures or dislocations)
- বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া (Electric shock)
- আগুন লাগা বা পুড়ে যাওয়া (Burns)
- বিষক্রিয়া (Poisoning)
- ডুবে যাওয়া (Drowning)
- গুরুতর আঘাত (Severe injuries)
প্রাথমিক চিকিৎসা (First Aid):
প্রাথমিক চিকিৎসা হলো জরুরী অবস্থায় আহত বা অসুস্থ ব্যক্তিকে পেশাদার চিকিৎসা আসার আগে তাৎক্ষণিক এবং সীমিত পরিসরে যে সাহায্য বা যত্ন দেওয়া হয়। এটি সাধারণত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিন্তু অ-চিকিৎসক ব্যক্তি দ্বারা সরবরাহ করা হয়, তবে যে কেউ সঠিক নির্দেশিকা অনুসরণ করে এটি করতে পারে।
প্রাথমিক চিকিৎসার প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হলো:
- জীবন রক্ষা করা (To preserve life)
- পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া থেকে প্রতিরোধ করা (To prevent the condition from worsening)
- ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কষ্ট লাঘব করা (To relieve suffering)
- সম্ভব হলে সুস্থতার পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া (To promote recovery)
কিছু সাধারণ প্রাথমিক চিকিৎসা:
- তীব্র রক্তপাত নিয়ন্ত্রণে চাপ প্রয়োগ করা (Controlling severe bleeding by applying pressure)
- শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দেওয়া (Giving artificial respiration/CPR if breathing stops)
- অজ্ঞান ব্যক্তিকে নিরাপদ অবস্থানে রাখা (Positioning an unconscious person safely)
- হাড় ভাঙলে বা মচকালে আক্রান্ত অঙ্গ স্থির করে রাখা (Immobilizing a fractured or sprained limb)
- পুড়ে গেলে ঠান্ডা জল ঢালা (Cooling a burn with cold water)
- শক প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা নেওয়া (Taking steps to prevent shock)
- বিষ খেলে বা কামড়ালে দ্রুত করণীয় নির্ধারণ করা (Knowing what to do immediately in case of poisoning or bites)
সম্পর্ক:
সহজ কথায়, জরুরী অবস্থা হলো সমস্যাটি, আর প্রাথমিক চিকিৎসা হলো সেই সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য নেওয়া প্রথম তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ। প্রাথমিক চিকিৎসার মূল লক্ষ্যই হলো জরুরী অবস্থায় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বাঁচিয়ে রাখা বা তার অবস্থা স্থিতিশীল রাখা যতক্ষণ না সে পেশাদার চিকিৎসা পায়। প্রাথমিক চিকিৎসা কোনোভাবেই পেশাদার চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং এটি পেশাদার চিকিৎসার পথ খুলে দেয় এবং রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়।
কখন দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে
এই অংশটি আপনাকে বিভিন্ন চিকিৎসা জরুরী অবস্থা সনাক্ত করতে সাহায্য করবে। নিম্নলিখিত লক্ষণ বা অবস্থাগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরী সেবায় যোগাযোগ করুন বা নিকটস্থ হাসপাতালে যান। সময় নষ্ট না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. তীব্র বুকে ব্যথা: বিশেষ করে যদি ব্যথা চাপ, ভার বা চিপে ধরার মতো হয়, যা বাম হাত, গলা, চোয়াল, পিঠ বা পেটে ছড়িয়ে যেতে পারে। এর সাথে শ্বাসকষ্ট, ঘাম, বমি বমি ভাব বা মাথা ঘোরা থাকতে পারে (হার্ট অ্যাটাকের প্রধান লক্ষণ)।
২. হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট: মনে হওয়া যেন পর্যাপ্ত বাতাস ঢুকছে না, কথা বলতে কষ্ট হওয়া, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, বুক খাঁচা দেবে যাওয়া (বাচ্চাদের ক্ষেত্রে)।
৩. কথা বলতে সমস্যা: কথা জড়িয়ে যাওয়া, অর্থহীন কথা বলা, বা কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া।
৪. শরীরের একদিক অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া: হঠাৎ করে মুখ, হাত বা পায়ের (বিশেষ করে শরীরের একপাশের) দুর্বলতা বা অবশ ভাব।
৫. চোয়াল বা মুখ বেঁকে যাওয়া: হাসার সময় মুখের একদিক স্বাভাবিক না থাকা।
৬. হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বা সম্পূর্ণ দৃষ্টি হারানো: এক চোখে বা দুই চোখে হঠাৎ ঝাপসা দেখা বা অন্ধকার হয়ে যাওয়া।
৭. হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা: জীবনে হওয়া সবচেয়ে খারাপ মাথাব্যথা, যা হঠাৎ করে শুরু হয় (“বজ্রপাতের মতো” মাথাব্যথা)।
৮. শারীরিক ভারসাম্য বা সমন্বয়ের অভাব: হঠাৎ করে হাঁটতে বা দাঁড়াতে অসুবিধা হওয়া, মাথা ঘোরা বা ভারসাম্যহীনতা। (৩-৮ নং স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে – মনে রাখবেন: ফাস্ট অ্যাকশন)
৯. মারাত্মক রক্তপাত: শরীরের কোথাও থেকে এমন রক্তপাত যা চাপ দেওয়ার পরও সহজে বন্ধ হচ্ছে না, বা রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হচ্ছে।
১০. মাথায় গুরুতর আঘাত: আঘাতের পর জ্ঞান হারানো, কিছু সময়ের জন্য স্মৃতিভ্রংশ, বমি হওয়া, তীব্র মাথাব্যথা, বিভ্রান্তি, কথা জড়িয়ে যাওয়া, খিঁচুনি বা অস্বাভাবিক আচরণ।
১১. জ্ঞান হারানো বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া: হঠাৎ করে সম্পূর্ণ জ্ঞান হারানো এবং সহজে জ্ঞান ফিরে না আসা।
১২. তীব্র অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া (Anaphylaxis): কোনো খাবার, ওষুধ, পোকামাকড়ের কামড় বা অন্য কিছুর সংস্পর্শে আসার পর হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, শরীর ফুলে যাওয়া (বিশেষ করে মুখ, জিহ্বা, গলা), কথা বলতে বা গিলতে অসুবিধা, সারা শরীরে চুলকানি ও ফুসকুড়ি, বা রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া।
১৩. শরীরের কোন অংশে হঠাৎ তীব্র ব্যথা: যেমন – পেটে অসহ্য ব্যথা যা কুঁকড়ে দেয়, বুকে তীব্র ব্যথা (যদি হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ না হয় তবুও), পিঠে হঠাৎ তীব্র ব্যথা, বা শরীরের কোনো অঙ্গে মারাত্মক ব্যথা যা সহ্য করা কঠিন।
১৪. বিষক্রিয়া: কোনো বিষাক্ত বস্তু (যেমন – ক্লিনার, কীটনাশক) বা অতিরিক্ত মাত্রায় ওষুধ ভুলবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে খেয়ে ফেলা।
১৫. ড্রাগ ওভারডোজ: যে কোনো ধরনের ড্রাগ অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়া।
১৬. কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়া: মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা, বিভ্রান্তি বা জ্ঞান হারানো, বিশেষ করে একই জায়গায় থাকা একাধিক ব্যক্তির মধ্যে এমন লক্ষণ দেখা গেলে।
১৭. হঠাৎ খিঁচুনি শুরু হওয়া: বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে যদি আগে কখনো খিঁচুনির ইতিহাস না থাকে বা খিঁচুনি ৫ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় (স্ট্যাটাস এপিলেপটিকাস)।
১৮. বারবার খিঁচুনি হওয়া: অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিকবার খিঁচুনি হওয়া।
১৯. মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়া: শরীরের বড় অংশ (প্রাপ্তবয়স্কদের ১০% বা শিশুদের ৫% এর বেশি) পুড়ে যাওয়া, মুখ, গলা, হাত, পা বা যৌনাঙ্গ পুড়ে যাওয়া, বা গভীর (তৃতীয়/চতুর্থ ডিগ্রি) পুড়ে যাওয়া।
২০. বৈদ্যুতিক শক বা রাসায়নিক দ্বারা পুড়ে যাওয়া।
২১. ধোঁয়ায় শ্বাস নেওয়া (Smoke Inhalation): আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাস নেওয়ার পর কাশি, শ্বাসকষ্ট, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন বা জ্ঞান হারানো।
২২. মারাত্মক উচ্চ জ্বর: বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে যদি জ্বর ১০৩°F (৩৯.৪°C) বা তার বেশি হয় এবং এর সাথে অন্যান্য গুরুতর লক্ষণ (যেমন – ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি, খিঁচুনি, র্যাশ) থাকে।
২৩. শিশুদের উচ্চ জ্বর: ৩ মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ১০0.৪°F (৩৮°C) বা তার বেশি জ্বর।
২৪. জ্বরের সাথে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া: বিশেষ করে যদি আলোতে সমস্যা হয় বা শরীরে লালচে বা বেগুনি রঙের ফুসকুড়ি (যা চাপ দিলে ফ্যাকাসে হয় না) থাকে (মেনিনজাইটিসের লক্ষণ)।
২৫. মানসিক অবস্থার হঠাৎ পরিবর্তন: হঠাৎ করে মারাত্মক বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক আচরণ, জায়গা-কাল-পাত্র সম্পর্কে ভুল ধারণা বা নিজের পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা না থাকা।
২৬. তীব্র উত্তেজনা বা অস্থিরতা যা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
২৭. সম্ভবত হাড় ভেঙে যাওয়া: কোনো আঘাতের পর তীব্র ব্যথা, অঙ্গের অস্বাভাবিক আকৃতি, সেখানে চাপ দিলে ব্যথা বা ফোলা, বা সেটি নাড়াতে না পারা।
২৮. মেরুদণ্ড বা ঘাড়ে আঘাত: কোনো আঘাতের পর ঘাড় বা পিঠে তীব্র ব্যথা, বা শরীরের কোনো অংশে হঠাৎ দুর্বলতা, অসাড়তা বা ঝাঁকুনি অনুভব করা।
২৯. শ্রোণীচক্র (Pelvis) বা উরুর হাড় ভেঙে যাওয়া: গুরুতর আঘাতের পর শ্রোণীচক্র বা উরুর হাড়ে তীব্র ব্যথা এবং নড়াচড়া করতে অক্ষমতা।
৩০. কোনো অঙ্গ (যেমন – আঙুল, হাত, পা) বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
৩১. গর্ভাবস্থায় বা প্রসবকালীন গুরুতর জটিলতা: যেমন – তীব্র রক্তপাত (যোনিপথে), তীব্র পেটে ব্যথা বা প্রসব বেদনা যা সময়ের অনেক আগে শুরু হয়েছে।
৩২. গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত রক্তচাপ (Preeclampsia) বা খিঁচুনি (Eclampsia): গর্ভাবস্থায় হঠাৎ উচ্চ রক্তচাপ, তীব্র মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা, পেটের উপরিভাগে ব্যথা বা খিঁচুনি।
৩৩. গর্ভধারণ সংক্রান্ত তীব্র বমি: গর্ভাবস্থায় মাত্রাতিরিক্ত বমি যার ফলে পানিশূন্যতা দেখা দেয় (Hyperemesis Gravidarum)।
৩৪. হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বা সম্পূর্ণ দৃষ্টি হারানো (বিশেষ করে যদি ব্যথা না থাকে) – রেটিনা ডিটাচমেন্টের লক্ষণ হতে পারে।
৩৫. হঠাৎ তীব্র চোখ ব্যথা: চোখে তীব্র ব্যথা, লালচে ভাব, ঝাপসা দৃষ্টি বা আলোর চারপাশে রঙধনু দেখা (একিউট গ্লুকোমার লক্ষণ)।
৩৬. রক্তে শর্করার মাত্রার আকস্মিক বিপজ্জনক পরিবর্তন (ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে):
- হাইপোগ্লাইসেমিয়া: রক্তে শর্করা খুব কমে যাওয়া যার ফলে কাঁপুনি, ঘাম, বিভ্রান্তি, দুর্বলতা, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা জ্ঞান হারানো।
- ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস (DKA): রক্তে শর্করা খুব বেড়ে গিয়ে মারাত্মক অসুস্থতা যার ফলে বমি বমি ভাব, বমি, পেটে ব্যথা, দ্রুত ও গভীর শ্বাসপ্রশ্বাস (Kussmaul breathing), ফলের মতো গন্ধযুক্ত নিঃশ্বাস, তীব্র তৃষ্ণা ও প্রস্রাব এবং বিভ্রান্তি।
- হাইপারঅসমোলার হাইপারগ্লাইসেমিক স্টেট (HHS): টাইপ ২ ডায়াবেটিসে রক্তে শর্করা অত্যাধিক বেড়ে গিয়ে তীব্র পানিশূন্যতা, দুর্বলতা, বিভ্রান্তি বা জ্ঞান হারানো।
৩৭. গুরুতর সংক্রমণের লক্ষণ (সেপসিস): তীব্র জ্বর বা শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া (কম তাপমাত্রা), শরীর কাঁপানো, মানসিক বিভ্রান্তি, দ্রুত হৃদস্পন্দন, দ্রুত শ্বাস, ত্বক ঠান্ডা ও ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া।
৩৮. তীব্র পানিশূন্যতা: বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বমি, ডায়রিয়া বা কম পানি পান করার কারণে মারাত্মক পানিশূন্যতা যার ফলে অতিরিক্ত দুর্বলতা, নিস্তেজ হয়ে যাওয়া, চোখ কোটরাগত হওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া, কান্নার সময় চোখে পানি না আসা (শিশুদের ক্ষেত্রে), বা জ্ঞান হারানো।
৩৯. শ্বাসপথে কিছু আটকে যাওয়া: গলায় খাবার, খেলনা বা অন্য কিছু আটকে গিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া, কথা বলতে বা কাশি দিতে না পারা।
৪০. পানিতে ডুবে যাওয়া বা শ্বাসরোধ হওয়া: পানিতে ডুবে যাওয়ার পর বা অন্য কোনো কারণে (যেমন ফাঁস লেগে) শ্বাসরোধের পর জ্ঞান হারানো, শ্বাস নিতে সমস্যা হওয়া বা ফেনা ওঠা কাশি।
৪১. অভ্যন্তরীণ রক্তপাত: শরীরের ভিতরে রক্তপাত যা বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, চরম দুর্বলতা, পেটে ফুলে যাওয়া বা তীব্র ব্যথা, মল বা প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া, বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
৪২. পেটে হঠাৎ তীব্র ব্যথা: অ্যাপেন্ডিসাইটিস, পিত্তথলিতে পাথর, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ (প্যানক্রিয়াটাইটিস), অন্ত্রের রক্তপাত বা ফুটো হওয়ার মতো মারাত্মক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
৪৩. লিভারের কার্যকারিতা হঠাৎ কমে যাওয়া (Acute Liver Failure): জন্ডিস (ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া), পেটে পানি জমা, বিভ্রান্তি, সহজে রক্তপাত বা কালশিটে পড়া।
৪৪. কিডনির কার্যকারিতা হঠাৎ কমে যাওয়া (Acute Kidney Injury): হঠাৎ প্রস্রাবের পরিমাণ খুব কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া, পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি বা বিভ্রান্তি।
৪৫. ফুসফুসে রক্ত জমাট বাঁধা (Pulmonary Embolism): হঠাৎ বুকে ব্যথা (শ্বাস নেওয়ার সময় বাড়ে), তীব্র শ্বাসকষ্ট, কাশি (রক্ত মিশ্রিত শ্লেষ্মা), দ্রুত হৃদস্পন্দন বা মাথা ঘোরা।
৪৬. পায়ের গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধা (Deep Vein Thrombosis – DVT): পায়ের (সাধারণত একটি পায়ের) তীব্র ব্যথা, ফোলা, লালচে ভাব ও গরম হয়ে যাওয়া। এটি ভেঙে গিয়ে ফুসফুসে গেলে পালমোনারি এমবোলিজম হতে পারে।
৪৭. মহাধমনী ছিঁড়ে যাওয়া (Aortic Dissection): বুকে বা পিঠের উপরিভাগে হঠাৎ করে তীব্র, ছিঁড়ে যাওয়ার মতো ব্যথা যা নিচের দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে।
৪৮. অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রক্ত সরবরাহ কমে যাওয়া (Acute Limb Ischemia): হঠাৎ করে হাত বা পা ঠান্ডা, ফ্যাকাশে, অসাড় ও তীব্র বেদনাদায়ক হয়ে যাওয়া।
৪৯. অণ্ডকোষে তীব্র ব্যথা (Testicular Torsion): অল্প বয়সী পুরুষ বা ছেলেদের অণ্ডকোষে হঠাৎ করে তীব্র ব্যথা, ফোলা ও লালচে ভাব।
৫০. হঠাৎ প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া (Acute Urinary Retention): মূত্রথলি ভর্তি থাকা সত্ত্বেও প্রস্রাব করতে সম্পূর্ণ অক্ষমতা, যা তীব্র ব্যথা সৃষ্টি করে।
৫১. তীব্র পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোক: অতিরিক্ত গরমে থাকার পর শরীরের তাপমাত্রা অত্যাধিক বেড়ে যাওয়া (১০৪°F বা ৪০°C এর বেশি), ত্বক গরম ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া, মাথা ধরা, মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি, বমি বমি ভাব বা জ্ঞান হারানো (হিটস্ট্রোক একটি মারাত্মক জরুরী অবস্থা)।
৫২. হাইপোথার্মিয়া: শরীরের তাপমাত্রা dangerously কমে যাওয়া (৯৫°F বা ৩৫°C এর নিচে), যার ফলে কাঁপুনি বন্ধ হয়ে যাওয়া, জড়তা, বিভ্রান্তি, দুর্বল পালস বা শ্বাসপ্রশ্বাস।
৫৩. সেপটিক আর্থ্রাইটিস: কোনো জয়েন্ট (যেমন হাঁটু, কোমর) হঠাৎ করে খুব ব্যথাযুক্ত, ফোলা, গরম ও লালচে হয়ে যাওয়া, এর সাথে জ্বর থাকতে পারে।
৫৪. অ্যাকিউট গাউট অ্যাটাক: যদিও সবসময় জরুরী নয়, তবে তীব্র ব্যথা ও ফোলা যা সাধারণ ওষুধে কমছে না এবং নড়াচড়ায় সম্পূর্ণ অক্ষমতা সৃষ্টি করছে।
৫৫. গলায় বা শ্বাসনালীতে ফরেন বডি আটকে যাওয়া: শিশু বা প্রাপ্তবয়স্কদের শ্বাসপথে কোনো বস্তু আটকে গিয়ে শ্বাসকষ্ট, কাশি বা নীলচে হয়ে যাওয়া।
৫৬. চোখের আঘাত: চোখে ধারালো কিছুর আঘাত, রাসায়নিক বা অ্যাসিড ঢুকে যাওয়া, চোখে তীব্র ব্যথা ও দৃষ্টি সমস্যা।
৫৭. প্রাণীর কামড় বা বিষাক্ত পোকামাকড়/সাপের কামড়: বিশেষ করে যদি কামড়ের জায়গায় মারাত্মক ফোলা, ব্যথা, সংক্রমণ বা শরীরের অন্য অংশে লক্ষণ (যেমন – শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি, বমি) দেখা যায়, বা যদি প্রাণীটি জলাতঙ্কযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৫৮. হঠাৎ করে শরীরের কোনো অংশ নাড়াতে না পারা বা সম্পূর্ণ অবশ হয়ে যাওয়া (প্যারালাইসিস)।
৫৯. গলা বা টনসিলের আশেপাশে ফোঁড়া (Peritonsillar Abscess): তীব্র গলা ব্যথা, গিলতে ও কথা বলতে সমস্যা, মুখ পুরো খুলতে না পারা, জ্বর।
৬০. টনসিলের মারাত্মক প্রদাহ (Epiglottitis): বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে হঠাৎ উচ্চ জ্বর, তীব্র গলা ব্যথা, গিলতে অসুবিধা, লালা ঝরা, শ্বাসকষ্ট ও ঝুঁকে বসার প্রবণতা। এটি একটি মারাত্মক এয়ারওয়ে ইমার্জেন্সি।
৬১. মারাত্মক বমি যা বন্ধ হচ্ছে না: বিশেষ করে যদি বমির সাথে রক্ত যায় (Hematemesis) বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দেয়।
৬২. মারাত্মক ডায়রিয়া যা বন্ধ হচ্ছে না: বিশেষ করে যদি মলের সাথে রক্ত যায় (Dysentery) বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দেয়।
৬৩. কালো বা আলকাতরার মতো পায়খানা (Melena): হজম হওয়া রক্তপাতের কারণে পায়খানার রং কালো ও আঁঠালো হয়, যা উপরের পাচনতন্ত্রে মারাত্মক রক্তপাতের লক্ষণ হতে পারে।
৬৪. ফ্রেশ লাল রক্ত পায়খানার সাথে যাওয়া: নিচের পাচনতন্ত্রে রক্তপাতের লক্ষণ হতে পারে, যা হেমোরয়েডস থেকে শুরু করে আরও গুরুতর কারণ পর্যন্ত হতে পারে।
৬৫. পেট হঠাৎ ফুলে যাওয়া ও তীব্র ব্যথা: অন্ত্রে বাধা (Bowel Obstruction) বা ছিদ্র হওয়ার লক্ষণ হতে পারে, এর সাথে বমি ও পায়খানা বন্ধ থাকতে পারে।
৬৬. পিত্তথলির তীব্র ব্যথা (Acute Cholecystitis): পেটের উপরিভাগে ডান পাশে হঠাৎ তীব্র ব্যথা যা পিঠে বা ডান কাঁধে ছড়িয়ে যেতে পারে, এর সাথে জ্বর, বমি বমি ভাব থাকতে পারে।
৬৭. প্যানক্রিয়াসের তীব্র প্রদাহ (Acute Pancreatitis): পেটের উপরিভাগে তীব্র ব্যথা যা পিঠে ছড়িয়ে যায়, এর সাথে বমি, জ্বর থাকতে পারে।
৬৮. কিডনিতে পাথর: কিডনি বা মূত্রনালীতে পাথর আটকে তীব্র ব্যথা যা পিঠের একপাশ থেকে কুঁচকি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, এর সাথে বমি বমি ভাব ও প্রস্রাবে রক্ত থাকতে পারে।
৬৯. হার্নিয়া আটকে যাওয়া (Strangulated Hernia): শরীরের কোনো অঙ্গ (যেমন অন্ত্র) হার্নিয়ার মাধ্যমে বেরিয়ে এসে আটকে গেলে সেখানে তীব্র ব্যথা, ফোলা, লালচে ভাব এবং বমি বমি ভাব হতে পারে। রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে এটি একটি জরুরী অবস্থা।
৭০. পেট শক্ত হয়ে যাওয়া (Rigid Abdomen): পেটে হাত দিলে যদি বোর্ড বা কাঠের মতো শক্ত অনুভূত হয়, যা পেটের ভিতরের কোনো অঙ্গে ছিদ্র বা মারাত্মক প্রদাহের লক্ষণ হতে পারে।
৭১. শরীরে শক-এর লক্ষণ: রক্তচাপ কমে যাওয়া, হৃদস্পন্দন খুব বেড়ে যাওয়া, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত ও অগভীর হওয়া, ত্বক ঠান্ডা, ফ্যাকাসে ও ঘামযুক্ত হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি বা জ্ঞান হারানো (এটি রক্তপাত, সংক্রমণ, অ্যালার্জি বা অন্য কোনো গুরুতর অবস্থার ফলাফল হতে পারে)।
৭২. গুরুতর মানসিক সংকট: যদি কোনো ব্যক্তি তাৎক্ষণিক নিজের বা অন্যের ক্ষতি করার হুমকি দেয় বা চেষ্টা করে, অথবা যদি গুরুতর মানসিক অসুস্থতার কারণে নিজের যত্ন নিতে বা নিরাপদ থাকতে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়ে।
৭৩. তীক্ষ্ণ বস্তু দ্বারা আঘাত: বিশেষ করে যদি আঘাত বুকে, পেটে, মাথায় বা গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালীর আশেপাশে হয়।
৭৪. বন্দুকের গুলিবিদ্ধ হওয়া।
৭৫. উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া (Significant Fall).
৭৬. গাড়ী দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো গুরুতর ট্রমা।
৭৭. ক্রাশ ইনজুরি: ভারী কোনো কিছুর নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আঘাত।
৭৮. শ্বাসরোধ (Asphyxiation): বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া।
৭৯. ঠান্ডায় শরীরের টিস্যু জমে যাওয়া (Severe Frostbite).
৮০. বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া (Electrocution).
৮১. বজ্রপাতে আঘাত।
৮২. বিষাক্ত গ্যাস বা রাসায়নিক বাষ্পে শ্বাস নেওয়া।
৮৩. মারাত্মক ডিহাইড্রেশন (পানিশূন্যতা) যা শিরায় স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজন।
৮৪. শিশুদের জ্বর ও তীব্র শ্বাসকষ্ট (Bronchiolitis, Severe Croup).
৮৫. শিশুদের শ্বাসকষ্টে নীলচে হয়ে যাওয়া (Cyanosis).
৮৬. নবজাতকের বা অল্প বয়সী শিশুর নিস্তেজ হয়ে যাওয়া, খেতে না পারা বা শরীরের তাপমাত্রা খুব কমে যাওয়া।
৮৭. শিশুদের অবিরাম বমি বা ডায়রিয়া যার ফলে দ্রুত পানিশূন্যতা হয়।
৮৮. শিশুদের হঠাৎ করে লিম্পিং (খোঁড়ানো) বা কোনো অঙ্গ ব্যবহার করতে না পারা, বিশেষ করে আঘাত বা জ্বরের পর।
৮৯. শিশুদের তীব্র পেটে ব্যথা ও জেলি-সদৃশ রক্তযুক্ত পায়খানা (Intussusception)।
৯০. শিশুদের অণ্ডকোষে তীব্র ব্যথা।
৯১. গর্ভবতী মহিলার যোনিপথে হঠাৎ রক্তপাত।
৯২. গর্ভাবস্থায় তীব্র পেটে ব্যথা যা সংকোচন (Contraction) নাও হতে পারে।
৯৩. প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তপাত (Postpartum Hemorrhage).
৯৪. নাভিরজ্জু বেরিয়ে আসা (Umbilical Cord Prolapse) প্রসবের সময়।
৯৫. হঠাৎ করে উচ্চ রক্তচাপ (Hypertensive Crisis) যার সাথে মাথাব্যথা, ঝাপসা দৃষ্টি বা বুকে ব্যথা থাকতে পারে।
৯৬. শরীরের তাপমাত্রা খুব বেড়ে যাওয়া (হাইপারথার্মিয়া) যা হিটস্ট্রোকের পর্যায়ে চলে গেছে।
৯৭. চোখের মণি (Pupil) ছোট বা বড় হয়ে যাওয়া যা আলোর প্রতি স্বাভাবিকভাবে প্রতিক্রিয়া করছে না, বিশেষ করে মাথায় আঘাত বা বিষক্রিয়ার পর।
৯৮. শরীরের কোনো অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া (Ischemia) যার ফলে তীব্র ব্যথা, অসাড়তা ও ফ্যাকাশে ভাব দেখা যায়।
৯৯. হঠাৎ করে শুনতে না পারা (Sudden Hearing Loss) – কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
১০০. শিশুদের জ্বর সহ নতুন করে কোনো ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দেওয়া যা দ্রুত ছড়াচ্ছে, বিশেষ করে যদি চাপ দিলে ফ্যাকাসে না হয়।
১০১. বুকে বা পেটে তীব্র ব্যথা সহ শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ও ঘাম হওয়া।
১০২. কোনো জানা অ্যালার্জেন (allergen) থেকে দূরে থাকার পরেও শ্বাসকষ্ট বা গলা ফুলে যাওয়া।
১০৩. বিষাক্ত মাকড়সা বা সাপের কামড়ের পর স্থানীয় বা সারা শরীরের মারাত্মক প্রতিক্রিয়া।
১০৪. বমি বমি ভাব, বমি ও পেটে ব্যথার সাথে তীব্র মাথাব্যথা।
হঠাৎ অজ্ঞান হলে করণীয়
হঠাৎ কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অজ্ঞান হওয়ার কারণ অনেক রকম হতে পারে, তাই প্রাথমিক চিকিৎসার পর দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
হঠাৎ অজ্ঞান হলে যা যা করণীয়:
- নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিন: যদি ব্যক্তি বিপজ্জনক স্থানে (যেমন রাস্তা, মেশিনের কাছাকাছি) থাকেন, তবে সাবধানে তাকে নিরাপদ ও সমতল স্থানে সরিয়ে আনুন। পড়ে গিয়ে যাতে মাথায় আঘাত না লাগে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
- চিৎ করে শুইয়ে দিন: ব্যক্তিকে চিৎ করে শুইয়ে দিন।
- পা দুটো উঁচু করুন: সম্ভব হলে অজ্ঞান ব্যক্তির পা দুটো শরীর থেকে প্রায় ৮-১২ ইঞ্চি উপরে তুলে ধরুন বা কোনো কিছুর উপর রাখুন। এতে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল সহজ হয়। (বিকল্পভাবে, পা না তুলে কেবল চিৎ করে শুইয়ে রাখলেও চলবে)।
- আঁটসাঁট পোশাক আলগা করুন: গলা, বুক এবং কোমর অঞ্চলের আঁটসাঁট পোশাক (কলার, বেল্ট) আলগা করে দিন যাতে শ্বাস নিতে সুবিধা হয়।
- শ্বাস-প্রশ্বাস দেখুন: দেখুন ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছে কিনা। নাকের কাছে কান নিয়ে বা বুকের ওঠানামা দেখে বোঝার চেষ্টা করুন।
- হালকা জাগানোর চেষ্টা: আস্তে করে ডেকে বা আলতো ঝাঁকুনি দিয়ে সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করুন।
- পাশে থাকুন: ব্যক্তিকে একা ফেলে যাবেন না। তার অবস্থার দিকে খেয়াল রাখুন।
- বাতাসের ব্যবস্থা করুন: ভিড় থাকলে সরিয়ে দিন এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন।
যা করবেন না:
- অজ্ঞান ব্যক্তির মুখে পানি ঝাপটা দেবেন না। এতে শ্বাস আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- জ্ঞান ফেরার আগে মুখে কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না।
- মাথার নিচে বালিশ দেবেন না, বরং সমতলভাবে শুইয়ে রাখুন।
জরুরি সাহায্য কখন চাইবেন (দ্রুত ডাক্তার ডাকুন বা হাসপাতালে নিন):
- যদি অজ্ঞান ব্যক্তি দ্রুত জ্ঞান ফিরে না পায় (যেমন ১-২ মিনিটের বেশি সময় লাগে)।
- যদি পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়ে থাকে।
- যদি শ্বাস নিতে কষ্ট হয় বা শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিক মনে হয়।
- যদি বুকে ব্যথা, হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ (যেমন মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, হাত-পা অবশ লাগা) দেখা যায়।
- যদি ব্যক্তি বয়স্ক হন বা তার আগে থেকে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, খিঁচুনি রোগ (Epilepsy) বা অন্য কোনো গুরুতর অসুস্থতা থাকে।
- যদি বারবার অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা ঘটে।
- যদি অজ্ঞান হওয়ার কোনো স্পষ্ট কারণ বোঝা না যায় (যেমন পানিশূন্যতা বা অতিরিক্ত গরম)।
জ্ঞান ফিরলে করণীয়:
- জ্ঞান ফিরে এলে ব্যক্তিকে দ্রুত উঠে দাঁড়াতে দেবেন না। কিছুক্ষণ শুইয়ে রাখুন।
- ধীরে ধীরে বসতে সাহায্য করুন।
- সম্পূর্ণ সজাগ হলে তাকে পানি বা শরবত খেতে দিতে পারেন (যদি কারণ পানিশূন্যতা বা রক্তে শর্করার অভাব মনে হয়)।
- জ্ঞান ফিরে এলেও কারণ জানার জন্য এবং ভবিষ্যতে এমনটা যেন না হয় তার জন্য অবশ্যই একজন ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
- মনে রাখবেন, হঠাৎ অজ্ঞান হওয়া একটি গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। তাই প্রাথমিক সাহায্যের পর অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
হিট স্ট্রোকের লক্ষণ ও চিকিৎসা
হিট স্ট্রোক (Heatstroke) হলো শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া একটি মারাত্মক ও প্রাণঘাতী অবস্থা। এটি হিট-সংক্রান্ত অসুস্থতার সবচেয়ে গুরুতর রূপ। যখন শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায় (সাধারণত ৪০° সেলসিয়াস বা ১০৪° ফারেনহাইটের বেশি) এবং শরীর নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারায়, তখনই হিট স্ট্রোক হয়। দ্রুত চিকিৎসা না করলে এটি মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড, কিডনি এবং পেশীসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে এবং এমনকি মৃত্যুও ঘটাতে পারে।
হিট স্ট্রোকের চিকিৎসা (Treatment of Heatstroke):
হিট স্ট্রোক একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যাবশ্যক।
প্রাথমিক চিকিৎসা (Immediate First Aid):
তাৎক্ষণিক জরুরী পরিষেবাতে ফোন করুন: দেরি না করে জরুরি নম্বরে (যেমন – ৯৯৯) ফোন করুন এবং অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন।
ব্যক্তিকে ঠান্ডা জায়গায় নিয়ে যান: দ্রুত আক্রান্ত ব্যক্তিকে সরাসরি রোদ থেকে সরিয়ে কোনো শীতল, ছায়াময় বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্থানে নিয়ে যান।
অতিরিক্ত পোশাক খুলে ফেলুন: শরীরের তাপ কমানোর জন্য টাইট বা ভারী পোশাক আলগা করে দিন বা খুলে ফেলুন।
দ্রুত শরীর ঠান্ডা করার ব্যবস্থা করুন: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিভিন্ন উপায়ে শরীর দ্রুত ঠান্ডা করার চেষ্টা করুন:
- জলে ডুবিয়ে দিন: সম্ভব হলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ঠান্ডা জলের টবে বা চৌবাচ্চায় ডুবিয়ে দিন।
- জল স্প্রে করে পাখা চালান: আক্রান্ত ব্যক্তির সারা শরীরে ঠান্ডা জল স্প্রে করুন বা ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিন এবং তার উপর দ্রুত গতিতে পাখা চালান। বাতাসের কারণে জল বাষ্পীভূত হয়ে শরীর ঠান্ডা হবে।
- আইস প্যাক ব্যবহার করুন: ঘাড়, বগল, কুঁচকি এবং পিঠের মতো জায়গায় বরফের প্যাক বা ঠান্ডা ভেজা কাপড় রাখুন, যেখানে বড় রক্তনালী রয়েছে।
- ঠান্ডা ভেজা চাদর ব্যবহার করুন: ঠান্ডা জলে ভিজানো একটি চাদর বা তোয়ালে দিয়ে শরীর মুড়িয়ে দিন।
পানীয় দেবেন না: যদি ব্যক্তি অজ্ঞান থাকে বা তার মানসিক অবস্থায় বিভ্রান্তি থাকে, তাহলে তাকে মুখে কোনো পানীয় দেওয়ার চেষ্টা করবেন না, কারণ এতে শ্বাসরোধ হতে পারে।
সংক্ষেপে পানিতে ডুবে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা
পানিতে ডুবে গেলে দ্রুত এবং সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে পারে। এখানে সংক্ষেপে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ আলোচনা করা হলো:
১. দ্রুত উদ্ধার: যদি সম্ভব হয়, দ্রুত ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে পানি থেকে উদ্ধার করুন। নিজের সুরক্ষার দিকেও খেয়াল রাখবেন।
২. শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা:
ব্যক্তিকে শুইয়ে দিন।
তার মুখ ও নাক থেকে ময়লা বা কাদা থাকলে পরিষ্কার করুন।
তার শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে কিনা পরীক্ষা করুন। বুকের ওঠানামা বা শ্বাস ফেলার শব্দ লক্ষ্য করুন।
যদি শ্বাস-প্রশ্বাস না চলে, দ্রুত কৃত্রিম শ্বাস (মুখ দিয়ে মুখে শ্বাস) শুরু করুন।
৩. বুকে চাপ (CPR):
যদি হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে যায় (নাড়ি স্পন্দন না পাওয়া যায়), তবে দ্রুত CPR শুরু করুন।
প্রতি ৩০টি বুকে চাপার পর ২টি কৃত্রিম শ্বাস দিন।
দক্ষ না হলে, শুধুমাত্র বুকে চাপ দিতে থাকুন।
৪. শরীর গরম রাখা:
ভেজা কাপড় সরিয়ে ফেলুন এবং শরীর শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে দিন।
কম্বল বা শুকনো কাপড় দিয়ে শরীর ঢেকে দিন যাতে হাইপোথার্মিয়া (শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়া) না হয়।
৫. হাসপাতালে স্থানান্তর:
যত দ্রুত সম্ভব অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন বা ব্যক্তিকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান।Even if the person appears
স্বাভাবিক, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া জরুরি, কারণ পরবর্তীতেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৬. বমি হলে:
যদি ব্যক্তি বমি করে, তবে তাকে একদিকে কাত করে দিন যাতে বমি শ্বাসনালীতে না যায়।
গুরুত্বপূর্ণ: এই পদক্ষেপগুলো প্রাথমিক জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা। এর পাশাপাশি, দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সেবার জন্য কল করা অত্যন্ত জরুরি।
সংক্ষেপে বৈদ্যুতিক শক লাগলে করণীয়
১. নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন: প্রথমে বিদ্যুতের উৎস বন্ধ করুন। মেইন সুইচ বন্ধ করা সবচেয়ে ভালো। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে শুকনো কাঠ বা প্লাস্টিকের মতো অপরিবাহী জিনিস দিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিদ্যুতের উৎস থেকে আলাদা করুন। খালি হাতে স্পর্শ করবেন না।
২. জরুরি পরিষেবা ডাকুন: অবিলম্বে ৯৯৯ নম্বরে কল করে জরুরি medical help চেয়ে নিন।
৩. আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করুন:
- শ্বাসপ্রশ্বাস পরীক্ষা করুন: যদি শ্বাস না নেয়, তাহলে CPR (Cardiopulmonary Resuscitation) শুরু করুন, যদি আপনি এটি করতে জানেন।
- পালস পরীক্ষা করুন: যদি পালস না থাকে, তাহলে CPR শুরু করুন।
৪. পোড়া জায়গা পরীক্ষা করুন: বিদ্যুতের কারণে ত্বক পুড়ে যেতে পারে। পোড়া জায়গায় ঠান্ডা পরিষ্কার জল ঢালুন (বরফ ব্যবহার করবেন না)। পোড়া জায়গা ঢেকে রাখার জন্য পরিষ্কার, শুকনো কাপড় ব্যবহার করুন।
৫. আশ্বস্ত করুন: আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন এবং তাকে আশ্বস্ত করুন।
৬. নড়াচড়া করাবেন না: যদি না প্রয়োজন হয়, আক্রান্ত ব্যক্তিকে নড়াচড়া করাবেন না। কারণ বৈদ্যুতিক শকের কারণে শরীরের ভিতরেও আঘাত লাগতে পারে, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
সংক্ষেপে বিষ খেলে প্রাথমিক চিকিৎসা
১. শান্ত থাকুন এবং পরিস্থিতি মূল্যায়ন করুন:
- বিষক্রিয়ার ধরন এবং পরিমাণ বোঝার চেষ্টা করুন।
- বিষের প্যাকেট বা বোতল থাকলে সেটি হাতে নিন।
২. জরুরি নম্বরে ফোন করুন:
- দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স বা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ফোন করুন এবং তাদের বিস্তারিত জানান।
- বিষ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে (যদি থাকে) ফোন করে পরামর্শ নিন।
৩. বমি করানোর চেষ্টা করবেন না (যদি না নির্দেশ দেওয়া হয়):
- কিছু ক্ষেত্রে বমি করানো বিপজ্জনক হতে পারে, যেমন – অ্যাসিড, পেট্রোলিয়াম পণ্য বা ক্ষয়কারী পদার্থ খেলে।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বমি করানোর চেষ্টা করবেন না।
- যদি বিষ খাওয়ার পরপরই বমি হয়ে যায়, তাহলে বমির নমুনা সংগ্রহ করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারেন।
৪. বিষ যদি ত্বকের সংস্পর্শে আসে:
- আক্রান্ত স্থানটি প্রচুর পরিমাণে জল এবং সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
- জামাকাপড় পরিবর্তন করুন।
৫. বিষ যদি চোখে লাগে:
- চোখ অন্তত ১৫-২০ মিনিট জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
- চোখ ঘষবেন না।
৬. শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হলে:
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে খোলা জায়গায় নিয়ে যান।
- যদি শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, তবে সিপিআর (CPR) এর প্রশিক্ষণ থাকলে তা প্রয়োগ করুন।
৭. আক্রান্ত ব্যক্তিকে শুইয়ে দিন:
- যদি রোগী অজ্ঞান হয়ে যায়, তবে তাকে একপাশে কাত করে শুইয়ে দিন যাতে বমি হলে শ্বাসরোধ না হয়।
- রোগীর শরীর গরম রাখার চেষ্টা করুন।
৮. হাসপাতালে নিয়ে যান:
- উপরের সব প্রাথমিক পদক্ষেপের পর দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
- বিষের প্যাকেট, বোতল বা বমির নমুনা থাকলে তা সঙ্গে নিয়ে যান।