এলার্জি হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার এক ধরনের অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। সাধারণত ক্ষতিকর নয় এমন অনেক বস্তুর প্রতিও শরীর যখন অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়, তখন তাকে এলার্জি বলা হয়। বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ এই অসহনীয় ব্যাধিতে ভুগে থাকেন।
এলার্জি কেন হয়?
প্রত্যেক মানুষের শরীরে একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম থাকে যা শরীরকে ক্ষতিকর বস্তু যেমন- পরজীবী, ছত্রাক, ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করে। কোনো কারণে এই ইমিউন সিস্টেমে গোলযোগ দেখা দিলে, এটি কিছু বস্তুকে ক্ষতিকর ভেবে প্রতিক্রিয়া শুরু করে। সাধারণত নিরীহ এসব বস্তুকে অ্যালার্জেন বলা হয়। যখন কোনো অ্যালার্জেন শরীরে প্রবেশ করে, তখন ইমিউন সিস্টেমের প্রতিক্রিয়া হিসেবে হিস্টামিন নামক রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়, যা এলার্জির বিভিন্ন উপসর্গ সৃষ্টি করে।
সাধারণ কিছু অ্যালার্জেন হলো:
নির্দিষ্ট কিছু খাবার যেমন-চিংড়ি, ইলিশ মাছ, গরুর মাংস, বেগুন, বাদাম, ডিম ও দুধ।
- ধূলাবালি, ফুলের রেণু।
- পোষা প্রাণীর লোম বা খুশকি।
- কিছু ঔষধ।
- পোকামাকড়ের হুল বা কামড়।
- ছত্রাক বা মোল্ড।
এলার্জির সাধারণ লক্ষণ
এলার্জির লক্ষণগুলো ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং এর তীব্রতাও কম বা বেশি হতে পারে। সাধারণ কিছু লক্ষণ হলো:
- ত্বকে চুলকানি, লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি হওয়া।
- শরীরের কিছু অংশ চাকা চাকা হয়ে ফুলে যাওয়া (আর্টিকেরিয়া)।
- হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া।
- চোখ চুলকানো, লাল হওয়া এবং পানি পড়া।
- কাশি এবং শ্বাসকষ্ট।
- বমি বমি ভাব, পেট ব্যথা বা ডায়রিয়া।
গুরুতর এলার্জির ক্ষেত্রে অ্যানাফাইল্যাক্সিস (Anaphylaxis) নামক একটি মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হতে পারে, যার ফলে রোগীর রক্তচাপ হঠাৎ কমে গিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
এলার্জির প্রকারভেদ ও নির্দিষ্ট লক্ষণ
এলার্জির প্রকাশ বিভিন্ন রূপে হতে পারে এবং এর লক্ষণগুলোও ভিন্ন ভিন্ন হয়।
লার্জিক রাইনাইটিস (Allergic Rhinitis): এটি নাকের এলার্জি। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো-ঘন ঘন হাঁচি, নাক দিয়ে ক্রমাগত পানি পড়া, নাক ও চোখ চুলকানো এবং নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া। এটি বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সিজনাল) বা সারাবছর (পেরিনিয়াল) হতে পারে।
অ্যাজমা বা হাঁপানি (Asthma): এটি শ্বাসনালীর এলার্জি। এর ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বুকের ভেতর সাঁই সাঁই শব্দ হয়, বুকে চাপ ощущается এবং ঘন ঘন কাশি হয়।
আর্টিকেরিয়া (Urticaria): এতে ত্বকে লালচে, চাকা চাকা ও ফোলা দাগ দেখা যায় এবং প্রচণ্ড চুলকানি হয়। এই দাগগুলো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিলিয়ে গেলেও বারবার হতে পারে।
অ্যালার্জিক কনটাক্ট ডার্মাটাইটিস (Allergic Contact Dermatitis): কোনো নির্দিষ্ট অ্যালার্জেন ত্বকের সংস্পর্শে এলে সেই স্থানে প্রদাহ, ফোসকা পড়া, চুলকানি এবং চামড়া ওঠার মতো লক্ষণ দেখা যায়।
একজিমা (Eczema): এটি একটি বংশগত চর্মরোগ, যার ফলে ত্বক শুষ্ক, খসখসে, লালচে হয়ে যায় এবং তীব্রভাবে চুলকায়। চুলকানোর ফলে ত্বক পুরু হয়ে যেতে পারে এবং কখনও কখনও রস ঝরতে পারে।
খাদ্যে এলার্জি (Food Allergy): নির্দিষ্ট কোনো খাবার খাওয়ার পর ত্বকে র্যাশ, চুলকানি, পেট ব্যথা, বমি বা ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
অ্যানাফাইল্যাক্সিস (Anaphylaxis): এটি একটি মারাত্মক ও জীবনহানিকর এলার্জিক প্রতিক্রিয়া। এর ফলে হঠাৎ করেই রক্তচাপ মারাত্মকভাবে কমে যায়, সারা শরীর ফুলে যায়, শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং রোগী শকে চলে যেতে পারে। এটি একটি জরুরি অবস্থা এবং এর জন্য তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন।
এলার্জি নির্ণয়ের পদ্ধতি
এলার্জির সঠিক কারণ বের করার জন্য কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে:
স্কিন প্রিক টেস্ট (Skin Prick Test): এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন সম্ভাব্য অ্যালার্জেনের সামান্য পরিমাণ ত্বকের উপর প্রয়োগ করে প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়। কোনো নির্দিষ্ট অ্যালার্জেনে সংবেদনশীলতা থাকলে সেই স্থানটি লাল হয়ে ফুলে ওঠে।
রক্ত পরীক্ষা (Blood Test): রক্তে IgE অ্যান্টিবডির মাত্রা পরীক্ষা করে এলার্জি শনাক্ত করা হয়। সাধারণত এলার্জি রোগীদের রক্তে এর মাত্রা বেশি থাকে।
প্যাচ টেস্ট (Patch Test): কনটাক্ট ডার্মাটাইটিসের কারণ নির্ণয়ের জন্য এই পরীক্ষা করা হয়। এতে সন্দেহজনক অ্যালার্জেনযুক্ত প্যাচ রোগীর পিঠে ৪৮ ঘণ্টার জন্য লাগিয়ে রাখা হয়।
আধুনিক চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা
সঠিক চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এলার্জি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
অ্যালার্জেন পরিহার: এলার্জি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো যে বস্তু বা খাবারে এলার্জি হয়, তা শনাক্ত করে এড়িয়ে চলা।
ঔষধ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ঔষধ সেবন করলে চুলকানি, হাঁচি এবং অন্যান্য লক্ষণ উপশম হয়। প্রয়োজনে নেজাল স্প্রে, ইনহেলার বা কর্টিকোস্টেরয়েড ব্যবহার করা হতে পারে।
ইমিউনোথেরাপি (Allergy Shots/Vaccine): এটি এলার্জির একটি আধুনিক ও দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট অ্যালার্জেনের একটি ক্ষুদ্র ও নিয়ন্ত্রিত ডোজ নিয়মিতভাবে শরীরে প্রয়োগ করে ধীরে ধীরে শরীরের সহনশীলতা বাড়ানো হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই পদ্ধতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন:
কিছু নিয়ম মেনে চললে এলার্জির প্রকোপ অনেকটাই কমানো যায়। যেমন: ঘরবাড়ি, বিছানার চাদর ও পর্দা নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং গরম পানিতে ধোয়া। ধুলাবালি ও ছত্রাক এড়াতে ঘরের পরিবেশ শুষ্ক রাখা।
বাইরে থেকে ফিরে কাপড় পরিবর্তন করা ও গোসল করা, বিশেষ করে পরাগরেণুর মৌসুমে।
মানসিক চাপ কমানোর জন্য ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম করা।
আগে ধারণা করা হতো যে এলার্জি একবার হলে আর সারে না। তবে বর্তমানে প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় করা গেলে এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে এলার্জি পুরোপুরি নিরাময় করাও সম্ভব। তাই এলার্জির লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।