কিডনি মানবদেহের একটি অপরিহার্য অঙ্গ, যা রক্ত পরিশোধন, বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশন, এবং শরীরে তরল ও খনিজ লবণের ভারসাম্য রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে। কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে এই অঙ্গটি তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যা গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে এবং পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি ঘণ্টায় পাঁচজনেরও বেশি মানুষ কিডনি বিকল হয়ে মারা যান।

কিডনি রোগের প্রকারভেদ

কিডনি রোগকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

অ্যাকিউট বা আকস্মিক কিডনি রোগ (Acute Kidney Injury): যখন কিডনি হঠাৎ করে এবং অল্প সময়ের মধ্যে তার কার্যক্ষমতা হারায়, তখন তাকে অ্যাকিউট কিডনি রোগ বলা হয়। ডায়রিয়া, বমি, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা সংক্রমণের কারণে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে এটি হতে পারে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা করা হলে এই ধরণের কিডনি রোগ থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব।

ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ (Chronic Kidney Disease): এই ক্ষেত্রে কিডনি ধীরে ধীরে এবং দীর্ঘ সময় ধরে তার কার্যকারিতা হারায় এবং এটি আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। এটি কিডনি রোগের সবচেয়ে সাধারণ রূপ।

কিডনি রোগের প্রধান কারণ ও ঝুঁকির কারণসমূহ

উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস কিডনি রোগের প্রধান দুটি কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।এছাড়াও আরও কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ হলো:

  • নেফ্রাইটিস: কিডনির প্রদাহজনিত রোগ।
  • বংশগত কারণ: পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে, যেমন পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ।
  • কিডনিতে পাথর: কিডনিতে পাথর হলে এবং সময়মতো চিকিৎসা না করালে তা কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে।
  • অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা: ধূমপান, স্থূলতা, এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
  • ঔষধের প্রভাব: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ঔষধ সেবন কিডনির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
  • বারবার মূত্রনালীর সংক্রমণ: মূত্রনালীর সংক্রমণ কিডনিকে প্রভাবিত করতে পারে।
  • এছাড়া ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

কিডনি রোগের লক্ষণ

কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না বলে একে “নীরব ঘাতক” বলা হয়। সাধারণত কিডনির ৭০ থেকে ৮০ ভাগ কর্মক্ষমতা নষ্ট হওয়ার আগে তেমন কোনো উপসর্গ বোঝা যায় না। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো:

  • প্রস্রাবের পরিবর্তন: প্রস্রাবের পরিমাণ কমে বা বেড়ে যাওয়া, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, বিশেষ করে রাতে। প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হওয়া বা ফেনা হওয়া।
  • শরীর ফুলে যাওয়া: কিডনি শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বের করতে না পারলে মুখ, পা এবং গোড়ালি ফুলে যায়।
  • শারীরিক দুর্বলতা ও ক্লান্তি: রক্তে বর্জ্য পদার্থ জমে যাওয়ার কারণে দুর্বলতা এবং ক্লান্তি অনুভূত হয়।
  • ক্ষুধামন্দা ও বমি বমি ভাব: খাওয়ার প্রতি অনীহা এবং বমি বমি ভাব দেখা দেয়।
  • ত্বকের সমস্যা: ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া এবং চুলকানি হতে পারে।
  • অন্যান্য লক্ষণ: শ্বাসকষ্ট, মনোযোগ কমে যাওয়া, মাংসপেশিতে টান লাগা এবং পিঠে ব্যথাও কিডনি রোগের লক্ষণ হতে পারে।

রোগ নির্ণয়

কিডনি রোগ নির্ণয়ের জন্য কিছু সাধারণ পরীক্ষা করা হয়:

  • রক্ত পরীক্ষা: রক্তের সিরাম ক্রিয়েটিনিন এবং ইউরিয়ার মাত্রা পরীক্ষা করে কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়।
  • প্রস্রাব পরীক্ষা: প্রস্রাবে অ্যালবুমিন বা প্রোটিনের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়, যা কিডনি রোগের একটি প্রাথমিক লক্ষণ।
  • ইমেজিং টেস্ট: আল্ট্রাসাউন্ড, সিটি স্ক্যান বা এমআরআই-এর মাধ্যমে কিডনির গঠন এবং কোনো অস্বাভাবিকতা পরীক্ষা করা হয়।

কিডনি রোগের বিভিন্ন পর্যায়

ক্রনিক কিডনি রোগকে সাধারণত eGFR (estimated Glomerular Filtration Rate) মানের ওপর ভিত্তি করে পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়, যা কিডনির কার্যকারিতা নির্দেশ করে।

চিকিৎসা ও প্রতিকার

কিডনি রোগের চিকিৎসা রোগের কারণ এবং পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে।

  • প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা: প্রাথমিক অবস্থায় রোগ ধরা পড়লে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ এবং কিছু ঔষধের মাধ্যমে রোগের অগ্রগতি ধীর করা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, লবণ ও প্রোটিনযুক্ত খাবার কম খাওয়া।
  • শেষ পর্যায়ের চিকিৎসা: যখন কিডনি প্রায় সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যায়, তখন দুটি প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতি হলো:
  • ডায়ালাইসিস: মেশিনের মাধ্যমে রক্ত পরিশোধন করা হয়।
  • কিডনি প্রতিস্থাপন: একজন সুস্থ মানুষের কিডনি রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়।

প্রতিরোধে করণীয়

সচেতন থাকলে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে কিডনি বিকল হওয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিডনি সুস্থ রাখতে কিছু করণীয়:

  • ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
  • নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা এবং শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।
  • ধূমপান এবং অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করা।
  • পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ঔষধ, বিশেষ করে ব্যথানাশক, সেবন না করা।
  • নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করানো, বিশেষ করে যাদের ঝুঁকি বেশি।
Translate »
error: Content is protected !!