Surgery preparation and aftercare ( সার্জারি প্রস্তুতি ও পরবর্তী যত্ন )

সার্জারির জন্য প্রস্তুতি এবং সেরে ওঠার জন্য সম্পূর্ণ নির্দেশিকা

যেকোনো অস্ত্রোপচার বা সার্জারি রোগী এবং তার পরিবারের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়। তবে সঠিক প্রস্তুতি এবং অস্ত্রোপচার পরবর্তী যথাযথ যত্ন নিলে পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ হয়ে ওঠে এবং রোগী দ্রুত আরোগ্য লাভ করতে পারে। সার্জারির প্রস্তুতি থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠা পর্যন্ত কী কী করণীয়, তার একটি বিস্তারিত নির্দেশিকা নিচে তুলে ধরা হলো।

সার্জারির পূর্ববর্তী প্রস্তুতি

অস্ত্রোপচারের টেবিলে যাওয়ার আগে রোগীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হয়। এই প্রস্তুতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে।

১. চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা:

প্রথমেই আপনার সার্জন বা চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করুন।আপনার রোগের ইতিহাস, বর্তমান শারীরিক অবস্থা, আপনি নিয়মিত কোনো ওষুধ খান কিনা (বিশেষ করে রক্ত তরল করার ওষুধ), এবং কোনো কিছুতে অ্যালার্জি আছে কিনা তা বিস্তারিত জানান। সার্জারির পদ্ধতি, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং ফলাফল সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিন। প্রয়োজনে দ্বিতীয় মতামতও নিতে পারেন।

২. প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা:

সার্জারির আগে চিকিৎসক আপনাকে কিছু পরীক্ষা করার পরামর্শ দেবেন। এর উদ্দেশ্য হলো, আপনি অ্যানেস্থেশিয়া বা অস্ত্রোপচারের জন্য শারীরিকভাবে উপযুক্ত কিনা তা নিশ্চিত করা। সাধারণ পরীক্ষাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা (CBC, RBS, S.Creatinine, Bleeding Time, Clotting Time, Blood Grouping)
বুকের এক্স-রে
ইসিজি (ECG)
প্রস্রাব পরীক্ষা
বয়স্ক বা হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ইকোকার্ডিওগ্রামও করা হতে পারে।
এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে রক্তে সংক্রমণ, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, ডায়াবেটিস এবং কিডনির কার্যকারিতা যাচাই করা হয়।

৩. খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা:

খালি থাকা: সাধারণত, অস্ত্রোপচারের ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা আগে থেকে কোনো কিছু খাওয়া বা পান করা নিষেধ করা হয়, এমনকি জলও। এর কারণ, অ্যানেস্থেশিয়ার সময় পাকস্থলীতে খাবার থাকলে তা ফুসফুসে চলে গিয়ে মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
পুষ্টিকর খাবার: সার্জারির আগের দিনগুলোতে স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার, যেমন ফল, শাকসবজি, এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন।
ধূমপান ও মদ্যপান ত্যাগ: ধূমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে তা ছেড়ে দেওয়া জরুরি। এগুলো অ্যানেস্থেশিয়ায় জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে এবং ক্ষত শুকাতে দেরি করায়।

৪. হাসপাতালে ভর্তির প্রস্তুতি:

হাসপাতালে যাওয়ার সময় চিকিৎসকের দেওয়া সব কাগজপত্র, প্রেসক্রিপশন এবং পরীক্ষার রিপোর্ট অবশ্যই সাথে নিন। আরামদায়ক পোশাক এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত জিনিসপত্র গুছিয়ে নিন।

সার্জারির পরবর্তী যত্ন

অস্ত্রোপচারের পর দ্রুত আরোগ্য লাভের জন্য সঠিক যত্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে কিছু নিয়ম মেনে চললে জটিলতার ঝুঁকি কমে এবং রোগী দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।

১. ক্ষতস্থানের যত্ন ও সংক্রমণ প্রতিরোধ:

ক্ষতস্থান পরিষ্কার ও শুকনো রাখা জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ড্রেসিং পরিবর্তন করতে হবে।
ক্ষতস্থানে হাত দেওয়ার আগে অবশ্যই ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে।
ক্ষতস্থানে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন, যেমন লাল হয়ে যাওয়া, ফুলে যাওয়া, অতিরিক্ত ব্যথা বা পুঁজ বের হলে, অবিলম্বে চিকিৎসককে জানাতে হবে।

২. সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি:

অস্ত্রোপচারের পর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং ক্লান্তি অনুভূত হয়। এই সময়ে সঠিক পুষ্টি দ্রুত আরোগ্যের জন্য অপরিহার্য।
প্রোটিন: ক্ষতস্থান দ্রুত শুকাতে এবং মাংসপেশির শক্তি পুনরুদ্ধারে প্রোটিন অপরিহার্য। মুরগির মাংস, মাছ, ডিম, ডাল ইত্যাদি খেতে পারেন।
ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: বেরি জাতীয় ফল (স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি), টক ফল, এবং গাঢ় রঙের শাকসবজি (গাজর, ব্রকোলি, ক্যাপসিকাম) প্রচুর পরিমাণে খান। এগুলোতে থাকা ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষত সারাতে ও কোষের পুনর্গঠনে সাহায্য করে।
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট: অলিভ অয়েল, নারকেল তেল এবং বাদামের মতো স্বাস্থ্যকর ফ্যাট সংক্রমণের ঝুঁকি কমায় এবং শক্তি জোগায়।
পর্যাপ্ত জল: প্রচুর পরিমাণে জল ও তরল খাবার গ্রহণ করুন।
যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন: ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার, এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার (যেমন সাদা পাউরুটি) এড়িয়ে চলা ভালো।

৩. ব্যথা নিয়ন্ত্রণ:

সার্জারির পর ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক। চিকিৎসক ব্যথানাশক ওষুধ দেবেন যা নিয়মমাফিক সেবন করতে হবে। ব্যথা সহ্য করে বসে না থেকে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

৪. বিশ্রাম ও শারীরিক কার্যকলাপ:

পর্যাপ্ত বিশ্রাম: দ্রুত সেরে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন।
হালকা ব্যায়াম: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, ধীরে ধীরে হাঁটাচলা শুরু করা উচিত। এটি রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে এবং রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
ভারী কাজ থেকে বিরত থাকা: নির্দিষ্ট সময়ের জন্য (সাধারণত কয়েক সপ্তাহ থেকে মাস) ভারী জিনিস তোলা বা কঠিন শারীরিক পরিশ্রম করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

৫. ফলো-আপ:

চিকিৎসক একটি নির্দিষ্ট সময় পর আপনাকে আবার দেখবেন, যা ফলো-আপ নামে পরিচিত। এই সময়ে আপনার আরোগ্যের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হবে। কোনো অবস্থাতেই ফলো-আপ বাদ দেওয়া উচিত নয়।

সঠিক প্রস্তুতি ও যত্ন যেকোনো সার্জারিকে সফল করতে এবং রোগীর দ্রুত আরোগ্য নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। তাই প্রতিটি ধাপে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

Translate »
error: Content is protected !!